হাদীস কত প্রকার ও কি কি?? হাদীস সংকলনের ইতিহাস..।

 অহী আল্লাহ প্রদত্ত । অহী (الوحوى) শব্দটি আরবি । যার অর্থ – ইঙ্গিত করা, প্রেরণ করা বা প্রত্যাদেশ করা । জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে যুগে যুগে নবী-রাসূলদের কাছে মানুষের জন্যে উপযোগী উপদেশ সম্বলিত আল্লাহ তায়ালার অবতারিত ভাষণকেই অহী বলে ।

মহান আল্লাহ রাসূল (সাঃ) এর ওপর যে সকল অহী নাযিল করেছেন তা দু’প্রকার । যথা

১, অহীয়ে মাতলু (وحى متلو) বা পঠিত প্রত্যাদেশ । 

২, অহীয়ে গায়রে মাতলু (وحى غير متلو) বা অপঠিত প্রত্যাদেশ ।

 

অহীয়ে মাতলু: 

متلو অর্থ- যা তিলাওয়াত করা হয়েছে । এর দ্বারা মূলত কুরআন উদ্দেশ্য । এটি এজন্য অহীয়ে মাতলু যে, এ প্রকার অহী প্রথমত আল্লাহর বাণীবাহক জিবরাঈল (আঃ) রাসূল (সাঃ) কে শব্দে শব্দে তিলাওয়াত করে শুনাতেন এবং রাসূলুলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেক রমযান মাসে তা জিবরাঈল (আঃ) কে তিলাওয়াত করে শুনাতেন । এক্ষেত্রে যে যে শব্দ ও বাক্যে অহী নাযিল হয়েছে তা হুবহু বহাল রাখতে রাসূল (সাঃ) বাধ্য ছিলেন । এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে – 

কুরআনুল কারিমে এরশাদ করেন…।

এটা (কুরআন) বিশ্ব পালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ ।তিনি (বিশ্বনবী জনাব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:) যদি নিজের কথা গুলি আমার নামে চালাতেন তাহলে আমি অবশ্যই তাঁর (বিশ্বনবীর) ডান হাত ধরে ফেলতাম । (অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা বা ঘাড় । তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতো না । এটা আল্লাহ ভীরুদের জন্য অবশ্যই একটি উপদেশ । (৬৯-সূরা আল হাক্কাহঃ৪৩-৪৮) 

 

অহীয়ে গায়রে মাতলু: 

গায়রে মাতলু হলো অপঠিত অহী । মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শুধুমাত্র বিষয়বস্তু অহী করা হতো । কিন্তু এ ধরনের অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত মূল বক্তব্যকে বা ভাবকে নিজস্ব ভাষায় প্রকাশ ও উপস্থাপন করার অধিকার রাসূল (সাঃ) এর ছিল ।তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই ভাবধারাটি রাসূল (সাঃ) অস্তঃকরণে সৃষ্টি করে দিতেন । তাই এটি অহীয়ে গায়রে মাতলু । এ ধরনের অহী সালাতে তিলাওয়াত করা যায় না । অহীয়ে গায়রে মাতলু দ্বারা হাদীস উদ্দেশ্য । 

সুতরাং একথা বলা যায়, হাদীস অহী এবং তা পরোক্ষ অহী । ইসলামী শরীয়তের মূলভিত্তি হিসেবে কুরআনের পরই হাদীসের স্থান । 

 

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

———————————–

রাসূল (সাঃ) এর হাদীসসমূহ তাঁর ও সাহাবীদের যুগে তিনটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে । 

  1. লিখিত আকারে,
  2. স্মৃতিতে ধরে রাখার মাধ্যমে এবং
  3. পঠন-পাঠনের মাধ্যমে ।

এই ধারাবাহিকতায় পর্যায়ক্রমে হাদীস সংগ্রহ, বিন্যাস ও পুস্তকাকারে সংকলং করা হয়েছে । সংকলনের এই সময়টাকে চারযুগে বিভক্ত করা যায় । 

 

প্রথম যুগ : নবী করীম (সাঃ) এর যুগ থেকে ১ম হিজরী শতকের শেষ পর্যন্ত হাদীস সংকলনের প্রথম যুগ ধরা হয় । এ যুগে সাহাবায়ে কিরামগণের সাথে একদল মহান তাবিয়ী ছিলেন । সাহাবীগণ রাসূল (সাঃ) এর বানীসমূহ পাওলনের মধ্যমে স্মৃতিতে ধরে রাখার পাশাপাশি পাথরে কিংবা সংরক্ষিত স্থানে লিখে রাখতেন ।

এ যুগের হাদীস সংরক্ষক ও সংকলকগণের মাধ্যে প্রসিদ্ধতম সাহাবীগণ হলেন –

  1. আবু হুরায়রা,
  2. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস,
  3. আয়েশা,
  4. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর,
  5. জাবের ইবনে আবদুল্লাহ,
  6. আনাস ইবনে মালেক,
  7. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) প্রমুখ ।

এই মহান সাহাবীদের প্রত্যেকেরই এক হাজারের অধিক হাদীস মুখস্থ ছিল । এ যুগের তাবিয়ীগণের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, উরওয়া ইবনুয যুবায়ের ও সালেম ইবনে আবদুল্লাহ রাফে (র) অন্যতম । 

 

দ্বিতীয় যুগ : এই যুগটি ১ম শতকের শেষের দিকে শুরু হয় এবং দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথমার্ধে গিয়ে শেষ হয়। এ যুগে তাবিয়ীদের একটি বিরাট দল তৈরি হয়ে যায় হাদীস সংকলনে । তারা প্রথম যুগের লিখিত ভান্ডারকে ব্যাপক সংকলনসমূহ একত্র করেন । এই যুগের হাদীস সংকলকগণের মাঝে ছিলেন…. 

  1. ইমাম ইবনে যুহরী (র),
  2. ইমাম মালেক ইবনে আনাস (র),
  3. আবদুল মালেক ইবনে জুরাইজ (র) ও
  4. ইমাম সুফিয়ান সাওরী (র) ছিলেন প্রসিদ্ধ । 

 

তৃতীয় যুগ : এ যুগ প্রায় দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত । এ যুগে নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহের সংকলন প্রস্তুত করা হয় । রাসূল (সাঃ) এর বাণীসমূহকে সাহাবী ও তাবিয়ীদের বাণী থেকে আলাদা করে সংকলন করা হয় । 

এভাবে যাচাই-বাচাই এবং গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর দ্বিতীয় যুগের সংকলনসমূহ তৃতীয় যুগের বিখ্যাত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় । এ যুগের প্রসিদ্ধ সংকলকগণ হলেন- 

  1. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র),
  2. ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারী (র),
  3. ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আবুল হুসাইনী আল-কুশারী (র), 
  4. ইমাম আবু দাউদ আশয়াছ ইবনে সুলাইমান (র),
  5. ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (র), 
  6. ইমাম আহমদ ইবনে শুয়াইব নাসায়ী এবং
  7. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মাজাহ আল-কাযবীনী (রাদি’আল্লাহু আনহু… ) । 

 

চতুর্থ যুগ : এ যুগ হিজরী পঞ্চম শতক থেকে শুরু হয় এবং তা বর্তমান কাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে । এ সুদীর্ঘ সময়ে তৃতীয় যুগের গ্রন্থ রচনার কাজ সমাপ্তি পর্যন্ত পোঁছে যায় । এ যুগে যে কাজ হয়েছে তাঁর অর্ণনা নিম্নে দেয়া হলো – 

  1. হাদীসসমূহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলির ভাষ্যগ্রন্থ, টীকা & বিভিন্ন  ভাষায় তরজমা/অনুবাদ গ্রন্থ রচিত হয়েছে ।
  2. হাদীসের যেসব শাখা-প্রশাখার কথা ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, সেসব বিষয়ের ওপর এ যুগের অসংখ্য গ্রন্থ এবং এসব গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ রচিত হয়েছে । 
  3. বিশেষজ্ঞ আলেমগণ নিজেদের আগ্রহ অথবা প্রয়োজনের তাগিদে তৃতীয় যুগের রচিত গ্রন্থাবলি থেকে হাদীস চয়ন করে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ প্রস্তুত করেছেন ।

এ ধরনের কয়েকটি গ্রন্থের নাম হচ্ছে – মিশকাতুল মাসাবীহ, রিয়াদুস সালেহীন, মুনতাকাল আখবার, বুলুগুল মারাম ও ইন্তেখাবে হাদীস ইত্যাদি ।

_______________________________________

হাফেজ মোঃ মহিব্বুল্লাহ আল ফারুক

ইমাম ও খতিব ,

উত্তর আমবাগান বায়তুল মা’মুর জামে মাসজিদ (চট্রগ্রাম )

_______________________________________

Comments

Popular posts from this blog

যেনা-ব্যভিচার কি? দর্শন নিয়ে আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলী কি?

প্রতিবেশীর অধিকার কি ? কেন মানুষ প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করবে ?

তাকওয়া কী ? কেন আমরা আল্লাহকে ভয় করবো ? এর কারণ কি ?