তাকওয়া কী ? কেন আমরা আল্লাহকে ভয় করবো ? এর কারণ কি ?
মানুষের ব্যক্তি ও সমষ্টি জীবনে ইসলামী জীবনাদর্শ বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে তাকওয়ার উপর নির্ভবশীল । তাকওয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তির পক্ষে ইহজগতে সৎ ও কল্যাণকর কাজ সম্পাদন করে পরজগতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয় । কারণ মানুষের মন মজ্জাগতভাবে সব সময় মানুষকে অসৎ ও অনিষ্টকর কাজ করার জন্যে ওয়াসওসা দেয় এবং আল্লাহদ্রোহীতায় লিপ্ত হওয়ার জন্যে প্ররোচিত করে । কাজেই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ছাড়া এ সব কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয় ।
১, তাকওয়া কি বা আল্লাহর ভয় বলতে আমরা কি বুঝি ?
———————————————————–
তাকওয়ার পরিচয়ঃ
তাকওয়া কি ? তাকওয়া (تقوى) আরবি শব্দ । (وقاية) হতে এর উৎপত্তি । আভিধানিক অর্থ – ভয় করা, বিরত থাকা, রক্ষা করা, সাবধান হওয়া, আত্মশুদ্ধি, পরহেযগারী,
তাকওয়ার সংজ্ঞাঃ
নিজেকে যে কোনো বিপদ থেকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা বা কোনো অনিষ্ট হতে নিজেকে দূরে রাখা ইত্যাদি । সাধারণ অর্থে আল্লাহ ভীতিকে তাকওয়া বলা হয় । ফারসী ভাষায় তাকওয়ার প্রতিশব্দ হচ্ছে পরহেযগারী । ইসলামী পরিভাষায় ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী বিধানে সকল প্রকার খারাপ কাজ ও চিন্তা পরিহার করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ মতো জীবন যাপনের মাধ্যমে আল্লাহকে প্রতিনিয়ত প্রেমমাখা ভয় করে চলাকে তাকওয়া বলে ।
তাত্ত্বিক অর্থে তাকওয়া বলা হয়ঃ
আল্লাহ-ভীতি জনিত মানুষের মনের সে অনুভূতিকে যা তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফুর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করে । কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, যে সকল ভাব, প্রবৃত্তি, কাজ পরজগতে ক্ষতিকর এবং যে সমস্ত কার্যকলাপ দৃশ্যতঃ বৈধ বলে মনে হলেও পরিণতিতে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে, সে সকল ভাব, প্রবৃত্তি ও কার্যকলাপ হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করাকে তাকওয়া বলে । তাকোয়ার গুনে গুণান্বিত ব্যক্তিকে “মুত্তাকি” বলে যার বহুবচন মুত্তাকীন ।
২, কেন আমরা আল্লাহকে ভয় করবো ?
—————————————–
يايها الذين امنوا اتقوا الله ولتنظر نفسٌ مّاقدمت لغد واتّقوا الله انّ الله خبيرٌ بماتعملون
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন কর বা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্ৰত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য বা পরকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে । আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কিছু কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
[১] এই আয়াতের ভিতরে কেয়ামতের কথা বোঝাতে গিয়ে لغدٍ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে আগামীকাল মানি পরকাল।[কুরতুবী]
[২] এখানে ঈমানদারদেরকে সম্বোধন করে তাদেরকে নসীহত করা হচ্ছে। আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হল, তিনি যে সমস্ত কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন,
তা সম্পাদন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা করো না। আয়াতে এই কথাটা তাকীদ স্বরূপ দু’বার বলা হয়েছে। কারণ এই তাকওয়া (আল্লাহর ভয়)ই মানুষকে সৎকর্ম করতে এবং অসৎকর্ম থেকে বাঁচাতে উৎসাহ দান করে।
[৩] কিয়ামতকে ‘আগামী কাল’ বলে আখ্যায়িত করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এর সংঘটন কাল বেশী দূরে নয়, বরং অতি নিকটে।
আল্লাহ এরশাদ করেনঃ (সূরা-আনবিয়াঃ০১ আয়াত) ٱقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِى غَفْلَةٍۢ مُّعْرِضُونَ
“মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন [১], অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে” [২]।
[৪] সুতরাং তিনি সকলকে তার আমলের প্রতিদান দেবেন। নেককারদেরকে তাদের নেক কাজের বদলা এবং পাপীদেরকে তাদের পাপের বদলা।
عن عائشة (رض) انّ رسول الله قال ياعائشة اياك ومحقرات الذّنوب فانّ لها من الله طالبا
আয়েশা সিদ্দিকা (রা) থেকে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, হে আয়েশা ! ক্ষুদ্র নগণ্য গুনাহ থেকেও দূরে থাকবে । কেননা আল্লাহর দরবারে (কিয়ামতের দিন) সেগুলো সম্পর্কে ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে । (ইবনে মাজাহ, হাদীস-৪২৪৩)
৩, আল্লাহকে ভয় করলে কি উপকার হবে না করলে কি ক্ষতি হবে ?
———————————————————————
ومن يطع الله ورسوله, ويخش الله ويتقه فَأولئك هم الفائزون
আর যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল সালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য করে, আল্লাহ্কে ভয় করে ও তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে তারাই কৃতকার্য বা সফলকাম ।
[১] এই আয়াতে চারটি বিষয় বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে, যে ব্যাক্তি এই ৪টি বিষয় যথাযথ পালন করে, সে-ই দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম। [দেখুন-তাবারী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] কোন কোন তাফসীর গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে ওমর (রা) একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে এই চারটি বিষয়ের ব্যাখ্যা ও পারস্পরিক পার্থক্য ফুটে উঠেছে । ওমর (রাঃ) একদিন মসজিদুন নববীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ, জনৈক রূমী গ্রাম্য ব্যাক্তি তার কাছে এসে বলতে লাগলোঃ
اشهدان لااله الا الله واشهد انّ محمدّا رسول الله
ওমর (রা) জিজ্ঞেস করলেনঃ ব্যাপার কি? সে বললোঃ আমি আল্লাহ্র ওয়াস্তে মুসলিম হয়ে গেছি। ওমর (রা) জিজ্ঞেস করলেনঃ এর কোন কারণ আছে কি? সে বললোঃ হ্যাঁ, আমি তাওরাত, ইঞ্জিল, যবূর ও পূর্ববর্তী নবীগণের অনেক গ্রন্থ পাঠ করেছি। কিন্তু সম্প্রতি জনৈক মুসলিম কয়েদীর মুখে একটি আয়াত শুনে জানতে পারলাম যে, এই ছোট্ট আয়াতটির মধ্যে সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থের বিষয়বস্তু সন্নিবেশিত রয়েছে। এতে আমার মনের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, এটা আল্লাহ্র পক্ষ থেকেই আগত। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জিজ্ঞেস করলেনঃ আয়াতটি কি? রূমী ব্যাক্তি উল্লেখিত আয়াতটিই তিলাওয়াত করলো এবং সাথে সাথে তার অভিনব তাফসীরও বর্ণনা করলো যে,
- ومن يطع الله আল্লাহ্র ফরয কার্যাদির সাথে,
- ورسوله রাসূলের সুন্নাতের সাথে,
- ويخش الله অতীত জীবনের সাথে
- এবং وَيَتَّقْهِ ভবিষ্যত জীবনের সাথে সম্পর্ক রাখে।
মানুষ যখন এই চারটি বিষয় পালন করবে, তখন তাকে فَأولئك هم الفائزون এর সুসংবাদ দেয়া হবে। فاىٔز তথা সফলকাম সে ব্যাক্তি, যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতে স্থান পায়। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একথা শুনে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে সুদূরপ্রসারী স্বল্পবাক্যসম্পন্ন অথচ ব্যাপক অৰ্থবোধক বাক্যাবলী দান করেছেন।” [বুখারীঃ ২৮১৫, মুসলিমঃ ৫২৩]
انّ الّذين يخشون ربّهم بالغيب لهم مغفرة واجرٌ كبير
যারা আমি আল্লাহকে ভয় করে দৃষ্টির অগোচরে বা গোপনে তাদের জন্য রয়েছে আমি আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা ও মহাপুরুস্কার (৬৭-মুলকঃ ১২ আয়াত)
৫, আল্লাহর ভয় অর্জনের মাধ্যমে কিভাবে অশালীন কাজ কর্ম গুলো দূর করতে পারি ?
—————————————————————————————–
يايها الذين امنوا اتقوا الله وكونوا مع الصدقين
হে ইমানদার লোকেরা ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যাদর্শ লোকদের সঙ্গী হও । (৯-তাওবাঃ১১৯)
সত্যবাদিতার কারণে আল্লাহ সূবহানাহু ওয়াতাআলা সেই তিনজন সাহাবী (রাঃ)-এর শুধু অপরাধই ক্ষমা করে দেননি; বরং তাঁদের তওবার কথা ও কুরআনুল কারিমের আয়াতরূপে অবতীর্ণ করেছেন। যার ফলে মু’মিনদেরকে আল্লাহ-ভীতি/ আল্লাহর ভয় অবলম্বন করার ও সত্যবাদীদের সঙ্গী সাথী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন । এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ-ভীতি বা আল্লাহর ভয় থাকবে সে সত্যবাদীও হবে। আর যে ব্যক্তি মিথ্যুক হবে, জেনে রাখুন যে, তার অন্তর আল্লাহ-ভীতি থেকে খালি হবে। এই জন্য হাদীসের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে, মিথ্যা বলা মুনাফিক্বের একটি লক্ষণ।
আমাদের স্বাভাবিক জিবনে দেখা যায় ভালো মানুষের সাথে চলা ফেরা করলে ভালো মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে আর খারাপ মানুষের সাথে চলাফেরা করলে খারাপ হওয়ার সম্ভানাই বেশি । এই জন্যে বলা হয়েছে সৎ সঙ্গে সর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাস । আমাদের প্রত্যেকের উচিত সৎ চরিত্রের অধিকারী মানুষের সাথে সঙ্গ দেয়া । আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করুন (আমিন)
_______________________________________
হাফেজ মোঃ মহিব্বুল্লাহ আল ফারুক
ইমাম ও খতিব ,
উত্তর আমবাগান বায়তুল মা’মুর জামে মাসজিদ (চট্রগ্রাম )
Comments
Post a Comment