সাহাবী কারা? কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যকার পার্থক্য।

 সাহাবীঃ সাহাবী (صحابى) আরবী শব্দ । বহুবচনে আসহাব (اصحاب) । যিনি ঈমান ও প্রত্যয়ের সাথে রাসূল (সাঃ) এর সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন এবং মৃত্যুর পৃর্ব মুহর্ত পর্যন্ত ঈমানের ওপর অটল ছিলেন, তাকে সাহাবী বলে ।

অন্য কথায়, যারা রাসূল (সাঃ) কে দেখেছেন, ঈমান এনেছেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের ওপর কায়েম বা দৃঢ় ছিলেন তারা হলেন সাহাবী । রাসূল (সাঃ) এর ওফাতের সময় প্রায় দেড়লক্ষ সাহাবী ছিলেন ।

তাবিয়ীনঃ যিনি কোন সাহাবী (রা) এর কাছে হাদীস অধ্যয়ন করেছেন অথবা অন্ততপক্ষে একবার তাকে দেখেছেন তাকে তাবিয়ী বলে । তাবিয়ীনদের সংখ্যা হাজার হাজার । এরা সাহাবীদের কাছ থেকে হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছেন । হাদীসের জ্ঞান আহরণ, তা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ।

তাবে-তাবেয়ীনঃ যিনি কোন তাবেয়ী (র) এর কাছে হাদীস অধ্যয়ন করেছেন বা তাকে দেখেছেন তাকে তাবে-তাবেয়ী বলে । তাদের সংখ্যাও হাজার হাজার । এরা তাবিয়ীনদের কাছে থেকে হাদীসের ইলম সংগ্রহ করে উম্মতের মধ্যে তা ছড়িয়ে ছিলেন । এভাবে বিশ্বব্যাপী কুরআন-হাদীসের আলো ছড়িয়ে পড়ে ।

এছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), আমর ইবনুল আস (রা), ও ওমর (রা), সেই সব সাহাবীর অন্তর্ভুক্ত যাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে ।

হাদীসে কুদসী পরিচিতি ও কতিপয় হাদীসে কুদসী
—————————————————————–
হাদীসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাদীসে কুদসী । এ হাদীসের মূল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর তা’আলার পক্ষ থেকে এসেছে । কুদসী শব্দটি আরবী ‘কুদুস’ হতে এসেছে, যার অর্থ হলো পবিত্র ও মহান ।

পরিচিতিঃ যে হাদীসের মূল কথা সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এসেছে সে হাদীসকে ‘হাদীসে কুদসী’ বলে । আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে ‘ইলহাম’ অথবা স্বপ্নযোগে এই মূল কথাগুলো জানিয়ে দিয়েছেন ।

কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ, আর হাদীসে কুদসীর শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু এর অর্থ, ভাব ও বিষয়বস্তু আল্লাহর নিকট থেকে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত । নিম্নে কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হল ।

কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যকার পার্থক্য
———————————————————-

  • কুরআন বিশিষ্ট দূত ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে নাযিল হয়েছে এবং এর শব্দ ও ভাষা নিশ্চিতভাবে লওহে মাহফূজ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে ।
    পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসীর মূল বক্তব্য আল্লাহর নিকট থেকে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত । এর ভাষা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিজস্ব ।
  • সালাতে কুরআন থেকে শুধু তেলাওয়াত কয়া হয়, কুরআন ছাড়া সালাত সহীহ হয় না ।
    পক্ষান্তরে সালাতে হাদীসে কুদসী পাঠ করা যায় না, হাদীসে কুদসী পাঠে সালাত আদায় হয় না ।
  • অপবিত্র অবস্থায় কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা হারাম ।
    কিন্তু হাদীসে কুদসী অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করতে পারবে ।
  • কুরআন মজীদ একটি মু’জিযা; কিন্তু হাদীসে কুদসী মু’জিযা নয় ।
  • কুরআন অমান্য করলে কাফের হয়ে যায়; কিন্তু হাদীসে কুদসী অমান্য করলে গুনাহ হয় বটে তবে কাফের হয়ে যায় না ।
  • কুরআন নাযিল হওয়ার জন্য আল্লাহ ও রাসূলের মাঝখানে জিবরাঈল (আ) বাহক ছিলেন; কিন্তু হাদীসে কুদসীর জন্য জিবরাঈলের মাধ্যম জরুরি নয় ।

নিম্নে কতিপয় হাদীসে কুদসী দেয়া হল –
—————————————————

(১) আনাস (রা) হতে বর্ণিত আল্লাহ তা’আলা বলেন – ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আমার দুর্গ । যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করল, সে আমার আযাব থেকে রেহাই পেল । (ইবনুন নাজ্জার)

(২) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, মহা প্রতাপশালী আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণার সাথে আছি । যদি সে আমার প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করে তা তারই সাথে থাকবে । আর যদি আমার প্রতি খারাপ ধারণা করে তাহলেও তা তাঁর সাথে থাকবে । (আহমদ)

(৩) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত আল্লাহ তা’আলা বলেন, যখন আমার বান্দা আমার সাক্ষাত ভালবাসে, আমিও তার সাক্ষাত ভালবাসি । আর যখন সে আমার সাক্ষাত ঘৃণা করে, আমিও তার সাক্ষাত ঘৃণা করি । (মুয়াত্তা ও বুখারী)

(৪) আহু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান ! ফজর ও আসরের সালাতের পর কিছুক্ষণের জন্য আমাকে স্মরণ করো তাহলে উভয় সালাতের মাঝামাঝি সময়ে আমি তোমার সহায়তা করব । (আবু নুয়াইম)

(৫) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি আমার বান্দার সাথে থাকি, যতক্ষণ সে আমাকে স্মরণ করে এবং আমার যিকিরের মধ্যে তার উভয় ঠোঁট নড়াচড়া করে । (ইবনে হিব্বান-৮১৫)

(৬) হযাইফা (রা) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমার স্মরণ যাকে এভাবে মাশগুল রাখে যে, সে আমার কাছে তার কাম্য বস্তু চাইবারও অবকাশ পায় না, আমি তার প্রয়োজন চাওয়ার আগেই তাকে দিয়ে থাকি । (আবু নুয়াইম)

(৭) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলা যখন সৃষ্টিকে প্রকাশ করলেন, তখন তিনি নিজ হাতে তাঁর নিজের জন্য অবশ্য কর্তব্য বলে লিখে দিলেন -নিশ্চয়ই আমার করুণা আমার রাগের উপর প্রভাব বিস্তার করবে । (ইবনে মাজাহ-৪২৯৫)

(৮) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, মূসা ইবনে ইমরান (আ) আরয করলেন, ‘হে প্রভু! তোমার বান্দার মধ্যে কে তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়?’ আল্লাহ বললেন, সেই ব্যক্তি, যে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয় । (বায়হাকী হাদীস-৮৩২,মিশকাত-৪৮৯৩ দুর্বল)

(৯) আনাস (রা) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন উচ্চৈঃস্বরে ডাকতে থাকবেন, আমার প্রতিবেশী কোথায়, আমার প্রতিবেশী কোথায়, তখন ফেরেশতাগণ আরয করবে, হে আমাদের প্রভু।আপনার প্রতিবেশী হওয়ার কার পক্ষে সম্ভব? তখন তিনি বলবেন, ‘মসজিদসমূহ আবাদকারীগণ কোথায়? (ইবনুন নাজ্জার)

(১০) আনাস (রা) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলা বলেন, তিনটি বস্তু আছে যে ব্যক্তি এদের হিফাযত করে সে আমার প্রকৃত বন্ধু । আর যে ঐগুলো নষ্ট করে সে আমার শত্রু । এগুলো হচ্ছে, সালাত, রোযা ও স্ত্রী সহবাসের গোসল । (ইবনুন নাজ্জার)

(১১) আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমার সাথীদের একটি দল কিয়ামতের দিন আমার কাছে অবতরণ করবে এবং তাদেরকে হাউজ থেকে পানি আহরণ করতে বাধা দেয়া হবে । তখন আমি বলব, হে আমার প্রভু! তারা আমার আসহাব (আমার উম্মত) । আল্লাহ বলবেন, নিশ্চয়ই তারা তোমার পর ধর্মে যে নতুন প্রথার প্রবর্তন করেছে তার সম্বন্ধে তোমার জানা নেই। তোমার পরে তারা পশ্চায়দগমন করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল । (বুখারী হাদীস-৬৫৮৫)

(১২) আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তাওরাতে লিখা আছে, যার কোন মেয়ে বার বছর বয়সে পৌঁছে, অথচ সে তাকে বিবাহ দেয় না – অতঃপর সে কোন গুনাহ করে, তবে তার সেই গুনাহ তার পিতার উপর পতিত হয় ।(বায়হাকী-৮৩০৩, মিশকাত-৩০০৪ হাদীস মুনকার)

_______________________________________

হাফেজ মোঃ মহিব্বুল্লাহ আল ফারুক

ইমাম ও খতিব ,

উত্তর আমবাগান বায়তুল মা’মুর জামে মাসজিদ (চট্রগ্রাম )

_______________________________________

Comments

Popular posts from this blog

যেনা-ব্যভিচার কি? দর্শন নিয়ে আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলী কি?

প্রতিবেশীর অধিকার কি ? কেন মানুষ প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করবে ?

তাকওয়া কী ? কেন আমরা আল্লাহকে ভয় করবো ? এর কারণ কি ?